মূল অংশে যান
Mimangsha
প্রবন্ধ

ইবনে রুশদের দর্শনে আল্লাহর অস্তিত্ব: দুনিয়ায় নবী না এলেও কি মানুষ আল্লাহকে চিনতে পারতো?

নবী-রাসূল ও আসমানি কিতাব ছাড়াই কি মানুষ যুক্তি ও চিন্তাশক্তির মাধ্যমে আল্লাহর অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারে? ইবনে রুশদের দর্শনের আলোকে একটি বিশ্লেষণ।

কল্পনা করুন তো, পৃথিবীতে কোনো একজন নবীও পাঠালেন না আল্লাহ তা’আলা। কোনো যুগেই পাঠালেন না ওহি। কোনো আসমানি কিতাব নাজিল হলো না। আল্লাহর পরিচয় পাওয়ার কোনো উপায়ও দেখানো হলো না। ঘটলো না কোনো মু’জিযাও। এই অবস্থায় আল্লাহর পরিচয় পাওয়া কি সম্ভব ছিলো আপনার জন্য?

ইবনে রুশদ বলছেন— হ্যা সম্ভব। আল্লাহ প্রেরিত কোনো একজন নবী বা রাসূল ছাড়াই আল্লাহকে চিনা মানুষের পক্ষে সম্ভব এবং সেটা আল্লাহরই দেওয়া চিন্তাশক্তি ও যুক্তি দিয়ে। কিন্তু কীভাবে?

ইবনে রুশদ বলছেন— আপনি বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তিকে পুরোপুরি ব্যবহার করে বিশ্বজগতের দিকে তাকালে আল্লাহর অস্তিত্বের দুটি সরল দলিল খুঁজে পাবেন। দলিল দুটি হলো-

১. দলিলুল ইনায়াহ (Proof of Divine Care)

২. দলিলুল ইখতিরা’ (Proof of Invention)

প্রথম দলিল: সবকিছু এত পরিপাটি কেন?

ধরুন, আপনি একটি ঘরে ঢুকলেন। সেখানে বিছানা গুছানো, টেবিলে খাবার রাখা, বাতি জ্বলছে, পাখা চলছে—সবকিছু আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্তুত। তখন কি আপনি বলবেন, ‘এসব নিজে নিজেই হয়ে গেছে’? নিশ্চয়ই না। আপনি বলবেন, ঘরের মালিক মেজবান আগে থেকেই সবকিছু পরিকল্পনা করে সাজিয়ে রেখেছে। ইবনে রুশদ বলেন, এই পৃথিবীও ঠিক তেমন। সূর্য ঠিক সময়মতো আলো দেয়, বৃষ্টি নামে, গাছ অক্সিজেন দেয়, নদী পানি বহন করে, প্রাণীরা মানুষের নানা কাজে আসে। পৃথিবীর প্রতিটি ব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো, যেন জীবন টিকে থাকতে পারে। এই অসাধারণ সামঞ্জস্য ও পরিকল্পনা প্রমাণ করে, এর পেছনে একজন প্রজ্ঞাময় পরিকল্পনাকারী আছেন। তিনিই আল্লাহ। এটিই ‘দলীলুল ইনায়াহ’।

দ্বিতীয় দলিল: জীবন এলো কোত্থেকে?

এবার একটি ছোট্ট বীজের কথা ভাবুন। সেটি মাটিতে পুঁতে দিলে কিছুদিন পর অঙ্কুর বের হয়, তারপর বড় হয়ে বিশাল একটি গাছে পরিণত হয়। আবার একটি ক্ষুদ্র ডিম থেকে একটি পাখি জন্ম নেয়, একটি শিশুও ধীরে ধীরে পূর্ণ মানুষে পরিণত হয়। প্রশ্ন হলো, এই প্রাণ, এই জীবন, এই বিস্ময়কর সৃষ্টি কে দিল? ইবনে রুশদ বলেন, জড় বস্তু নিজেরাই জীবন সৃষ্টি করতে পারে না। কোনো কিছু নিজে নিজেই নিজের স্রষ্টা হতে পারে না। তাই প্রতিটি নতুন সৃষ্টি আমাদের জানিয়ে দেয়, একজন স্রষ্টা আছেন, যিনি সবকিছুকে অস্তিত্ব ও জীবন দান করেছেন। এটিই ‘দলীলুল ইখতিরা’।

এই দুটি দলীলের মাধ্যমে ইবনে রুশদ বলতে চান, মানুষ যদি খোলা চোখে প্রকৃতিকে দেখে এবং নিজের বুদ্ধিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে, তাহলে এই বিশ্বজগতই তাকে আল্লাহর অস্তিত্বের দিকে পথ দেখিয়ে দেবে।

এখন প্রশ্ন হলো— আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো নবী বা আসমানি কিতাব ছাড়াই, যদি মানুষের বুদ্ধিই তাকে স্রষ্টার অস্তিত্ব ও মা’রেফাত পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে আল্লাহ কেন যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠালেন? কেন নাজিল করলেন আসমানি কিতাব? অন্যভাবে বললে, আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরার নববী দায়িত্ব কি দার্শনিক ব্যক্তি আঞ্জাম দিয়ে ফেলতে পারছে? এক্ষেত্রে ইবনে রুশদের চোখে নবী আর দার্শনিকের মাঝে পার্থক্য কী? ইবনে রুশদের দর্শনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায়টা শুরু হয় এখান থেকেই। যা তিনি তার অমর গ্রন্থ ‘আল কাশফু আন মানাহিজিল আদিল্লাহ’ কিতাবে উল্লেখ করেছেন।

সাজ্জাদ আকবর

সাজ্জাদ আকবর একজন তরুণ গবেষক ও লেখক। কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের আকিদা ও দর্শন বিভাগ থেকে ইসলামি ধর্মতত্ত্বে মাস্টার্স সম্পন্ন করে তিনি এখন এমফিল গবেষণায় নিয়োজিত। ইসলামি দর্শন, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, জ্ঞানতত্ত্ব ও সমাজদর্শন তার আগ্রহের কেন্দ্রে। ইবনে রুশদ, ইবনে খালদুন ও ইমাম গাজালির চিন্তাকে সমকালীন প্রশ্নের আলোকে পাঠ করাই তাঁর গবেষণার মূল দিক। ইসলামি ঐতিহ্য কীভাবে যুক্তি, বিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে, এ প্রশ্নই তার লেখা ও আলোচনার মূল উপাদান। ঢাকার মা’হাদুল ফিকরি ওয়াদ দিরাসাতিল ইসলামিয়া-এ তিনি প্রভাষক হিসেবে কর্মরত এবং Ibn Rushd Forum on Islam & Social Questions-এর প্রতিষ্ঠাতা। সহ-লেখক হিসেবে তার প্রকাশিত বই Islam & Orientalism (২০২১) এবং দুঃসময়ের বধ্যভূমিতে উত্থানের চাষাবাদ (২০২০)।