মূল অংশে যান
Mimangsha
প্রবন্ধ

দুই বাংলাদেশীর মৃত্যুদণ্ড: সৌদি আরব কি শরয়ি বা মানবিক কোনো আইন লঙ্ঘন করেছে? একটি ফিকহি ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কি শরিয়াহর মানদণ্ডে ন্যায়সংগত? হদ ও তা’যিরের সীমা, মাকাসিদুশ শরিয়াহ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার আলোকে এই প্রশ্নের ফিকহি পর্যালোচনা করেছেন তরুণ আলেম, লেখক ও গবেষক সাজ্জাদ আকবর।

এই লেখায় ৭ টি পয়েন্টে আলোচনা করা হবে— ১. ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট ২. দুই বাংলাদেশির অপরাধের বর্ণনা ৩. এই বিচার কি আল্লাহর আইন (শরিয়াহ) মেনে করা হয়েছে? ৪. সৌদি আরবের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা কী বলছে? ৫. আন্তর্জাতিক আইন কি এই রায়ের পক্ষে? ৬. সৌদি-বাংলাদেশ ডিপ্লোমেটিক চুক্তি রক্ষা করা হয়েছে? ৭. বিচারগত শ্রেণীবৈষম্য হয়েছে কি?

এগুলোর মধ্য হতে শুধুমাত্র ৩ নং পয়েন্ট— ‘এই বিচার কি আল্লাহর আইন মেনে করা হয়েছে?’এখানে তুলে ধরা হয়েছে। বাকি অংশ সহ সম্পূর্ণ রচনা পিডিএফ ফরম্যাটে অচিরেই প্রকাশ করা হবে।)

৩. এই মৃ*ত্যুদণ্ড নিয়ে আল্লাহর আইন (শরিয়াহ) কী বলছে:

৩:১. এখানে আমরা মাসআলাটির দুটি চিত্র ধরে নিচ্ছি। কারণ, যথাযথ তথ্য সৌদি কর্তৃপক্ষ পূর্ণাঙ্গরূপে প্রকাশ করে নি।¹ ফলে তথ্যের ঘাটতি থেকে সম্ভাব্য দুটি চিত্রপটেরই ফিকহি পর্যালোচনা করতে হচ্ছে।

#প্রথম_চিত্র: প্রাপ্তবয়স্ক, দুজন অবিবাহিত নারীপুরুষ ব্যভি*চারে লিপ্ত হয়েছে। তাতে চারজন সাক্ষীর সাক্ষ্য পাওয়া গেছে অথবা তারা স্বেচ্ছা স্বীকারোক্তি দিয়েছে এবং যথাযথ শরঈ প্রক্রিয়ায় তাদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।² এমতাবস্থায় তাদের শরঈ শাস্তি হলো: প্রথমত, মূল অপরাধের শাস্তি: অবিবাহিত নারীপুরুষের অবৈধ মেলামেশা চারজন সাক্ষীর মাধ্যমে প্রমাণিত হলে এর জন্য ইসলাম সুনির্ধারিত শাস্তি (হদ) দিয়েছে ১০০ টি করে বেত্রাঘাত।³ এই শাস্তি কুরআনে অকাট্যভাবে নির্ধারিত, ফলে হদের ১০০ বেত্রাঘাতের পরিমাণে কোনো পরিবর্তনের সুযোগ নেই। (হাদীসে ১০০ বেত্রাঘাতের পাশাপাশি এক বছর দেশান্তরিত রাখার কথা যুক্ত করা হয়েছে।⁴ তবে সেটা ‘হদ’ এর অংশ কিনা সেটা নিয়ে ফিকহি মতভেদ আছে।) দ্বিতীয়ত, পারিপার্শ্বিক অপরাধের শাস্তি: (মসজিদুল হারামের সীমানার ভিতরে পাপকাজ করা) এর শাস্তি কী হবে, সেটা কুরআন-সুন্নাহে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। বরং বিচারকের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, পরিভাষায় যেটাকে বলে ‘তা’যির’।⁶ (এক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়াহর মূলনীতি, যেটা খোদ সৌদির বিচার ব্যবস্থা অনুসরণ করে সেটি হলো— যে অপরাধের জন্য হদ নির্ধারিত আছে, তার সঙ্গে যুক্ত তা’যির কখনো সেই হদের সমান বা তার চেয়ে বেশি হতে পারবে না।)⁷

সৌদি আদালত মূলত হাম্বলি মাযহাব অনুসরণ করে।⁸ আর হাম্বলি মাযহাবে তা’যিরের সীমা অন্য মাযহাবগুলোর চেয়েও সীমিত। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের প্রসিদ্ধ মত হলো, তা’যিরে দশ বেত্রাঘাতের বেশি দেওয়া যাবে না।⁹ তার দলিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিস: হদ ছাড়া কোনো অবস্থায়ই বেত্রাঘাত দশটির বেশি দেওয়া যাবে না। (বুখারি ও মুসলিম)¹⁰ হাম্বলি মাযহাবের অন্য বর্ণনায় এর চেয়ে বেশি অনুমোদিত থাকলেও সেখানে বাড়তি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সেটি হলো, যে জাতীয় পাপের একটি হদ আছে, সমজাতীয় পাপের তা’যির সেই হদ পর্যন্ত পৌঁছাবে না।¹¹ ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ির মতও মোটামুটি একই। মানে তা’যির হদকে অতিক্রম করবে না।¹²

পবিত্র সময় বা স্থানে অপরাধের ক্ষেত্রে খোলাফায়ে রাশেদিনের একটি নজিরও আছে। রমজান মাসে মদপানকারীকে আলী (রা.) মদের হদ ৮০ বেত্রাঘাত দেওয়ার পর রমজানের মর্যাদা লঙ্ঘনের জন্য অতিরিক্ত ২০ বেত্রাঘাত দিয়েছিলেন। উমর (রা.) সম্পর্কেও এরকম বর্ণনা আছে (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা; সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের আপত্তি রয়েছে)।¹³ তার মানে পবিত্রতা লঙ্ঘনের কারণে শাস্তির পরিমাণ বেড়েছে খানিকটা, শাস্তির ধরন বদলায়নি। বেত্রাঘাতের শাস্তি রূপ নেয়নি মৃত্যুদণ্ডে। সুতরাং প্রথম চিত্রে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হতো হদ হিসেবে ১০০ বেত্রাঘাত (সঙ্গে মতভেদপূর্ণ এক বছরের নির্বাসন), এবং পবিত্র হারাম শরীফের মর্যাদা লঙ্ঘনের জন্য বিচারকের বিবেচনায় কিছু অতিরিক্ত তা’যির। কোনো অবস্থাতেই মৃত্যুদণ্ড নয়।

#দ্বিতীয়_চিত্র: ধরে নিই— ব্যভিচার চারজন সাক্ষী বা যথাযথ শরঈ পদ্ধতিতে প্রমাণিত হয়নি। অথবা ব্যভিচার ঘটেই নাই। বরং অন্য কোনো অনৈতিক আচরণ হয়েছে। ফলে ‘হদ’ এর পর্যায় থেকে সরে ‘তা’যির’ এর পর্যায়ে যাওয়া হয়েছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে শরিয়াহর মূলনীতি হলো, যথাযথ দলিল প্রমাণ ও সাক্ষীর অভাব থাকলে সন্দেহের সৃষ্টি হয়, আর সন্দেহ সৃষ্টি হলে হদ প্রয়োগের সুযোগ থাকে না। ¹⁴ তখন বিচারক কেবল বিকল্প উপায়ে (তা’যির) বিচার করতে পারেন। কিন্তু সেই তা’যিরও ব্যভিচারের হদের নিচে থাকতে হবে। কারণ ফুকাহায়ে কেরামের সুস্পষ্ট নীতি হলো, ব্যভিচারের প্রাথমিক কাজ বা অপ্রমাণিত অভিযোগের শাস্তি পূর্ণ প্রমাণিত ব্যভিচারের শাস্তির চেয়ে বেশি হতে পারে না।¹⁵

এখানে লক্ষণীয় হলো, সৌদি কর্তৃপক্ষ নিজেই বলেছে শাস্তিটি ‘তা’যির’ হিসেবে দেওয়া হয়েছে, হদ হিসেবে নয়।¹⁶ এ থেকে বোঝা যায়, বাস্তবে দ্বিতীয় চিত্রটিই ঘটেছে। অর্থাৎ হদের প্রমাণ-শর্ত পূরণ হয়নি বা সরাসরি ব্যভিচার ঘটেই নি। আর যেখানে প্রমাণের দুর্বলতার কারণে ১০০ বেত্রাঘাতের হদও প্রয়োগ করা যায় নি, সেখানে তা’যিরের নামে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া শরিয়াহর যুক্তির সম্পূর্ণ উল্টো। সন্দেহ শাস্তিকে হালকা করে, কঠোর করে না।

ইনসাফের খাতিরে উল্লেখ করা দরকার, হানাফি মাযহাব এবং হাম্বলি ফিকহের ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়িম রহ. ‘সিয়াসাহ শরইয়্যাহ’-র অধীনে তা’যির হিসেবে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করেছেন।¹⁷ তবে তাদের শর্ত ছিল কঠোর। অপরাধীর ফাসাদ হত্যা ছাড়া অন্য কোনোভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলে সর্বশেষ উপায় হিসেবে মৃত্যুদণ্ডকে অনুমোদন করা হয়েছে। যেমন শত্রুপক্ষের গুপ্তচরবৃত্তি, বারবার ভয়ংকর অপরাধে জড়ানো, কিংবা সমাজে বিভেদ-নৈরাজ্য সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী কিংবা মাদক দিয়ে সমাজকে অস্থিরতা ও ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে যাওয়া কোনো ব্যক্তি।¹⁸ একবারের ঘটনায়, তিন বছরের বেশি কারাভোগ করা দুজন দরিদ্র শ্রমিকের ক্ষেত্রে এগুলোর কোনটা পাওয়া গেলো? সেই তথ্য তো সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করতে পারলো না।¹⁹

ফলাফল: দুই চিত্রের কোনোটিতেই, এমনকি সৌদি আরবের অনুসৃত হাম্বলি মাযহাবের মানদণ্ডেও, এই মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে স্পষ্ট শরঈ ভিত্তি আমরা খুঁজে পাচ্ছি না।

৩:২. এই মৃত্যুদণ্ডে কি মাকাসিদুশ শরিয়াহ লঙ্ঘন হয়েছে?

ইসলামি আইনের মূল উদ্দেশ্য বা ‘মাকাসিদুশ শরিয়াহ’ হলো পাঁচটি বিষয়কে হেফাজত রাখা— আল্লাহর দীন, মানুষের জীবন, বুদ্ধি, বংশ এবং সম্পদ।²⁰ এর মধ্যে মানুষের জীবন রক্ষা (হিফজুন নাফ্স) মাকাসিদের জরুরিয়াত স্তরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। কুরআন বলছে—‘আল্লাহ যে প্রাণকে হারাম করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তোমরা সেই প্রাণ হত্যা করো না।’ (সূরা আল-আন‘আম, ৬:১৫১)²¹ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিমের রক্ত হালাল হওয়ার তিনটি কারণ নির্দিষ্ট করেছেন: বিবাহিত ব্যক্তির ব্যভিচার, হত্যার বদলে হত্যা, এবং দীন ত্যাগ করে জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।²² মোটকথা, শরিয়াহর প্রতিটি শাস্তির পেছনে একটি উদ্দেশ্য আছে। তা’যিরের মূল উদ্দেশ্য সংশোধন ও প্রতিরোধ, অপরাধীকে মেরে ফেললে সংশোধন কার জন্য?²³ এবার তাহলে প্রশ্ন— এই মৃত্যুদণ্ড শরিয়াহর কোন উদ্দেশ্য পূরণ করলো, আর কোনটি লঙ্ঘন করলো?

প্রথমত: ফাসাদের মাত্রা কতটুকু? তা’যির হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় তখনই, যখন অপরাধটি সমাজে ফাসাদ বা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ তৈরি করে।²⁴ যেমনটা একটু আগেই উল্লেখ করলাম। সৌদি আরব নিজেও তা’যিরে মৃত্যুদণ্ড দেয় তখন, যখন কেউ মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদের মতো অপরাধে সমাজ ত্রাস, ক্ষয় আর ধ্বংসের রাজত্বে পরিণত করে তখন।²⁵ যেসব ক্ষেত্রে ক্ষতি ছড়িয়ে পড়ে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বহু মানুষের জীবন পড়ে ঝুঁকিতে। এই মানদণ্ডে আলোচ্য ঘটনাটা একটু মিলিয়ে দেখা যাক— তারা কি কোনো সিরিয়াল রেপ করেছিল, রাষ্ট্রদ্রোহিতা কিংবা গুপ্তচরবৃত্তি করেছিল, নাকি বারবার ইয়াবা-মদের চালান এনে সমাজকে করে তুলেছিল দুর্বিষহ? এই ঘটনায় কি জোরজবরদস্তি-সহিংসতা ছিল? কারও প্রাণহানি, সম্পদহানি বা জননিরাপত্তার হুমকি ছিল? বারবার অপরাধের রেকর্ড ছিল? এমন কোনো তথ্য সৌদি কর্তৃপক্ষ দিলে তো শুনতাম।²⁶ তাদের অপরাধকে জাস্টিফাই করার সুযোগ নেই। অবশ্যই অপরাধ ছিল নিকৃষ্টতম, কিন্তু সেটা তো সীমিত ছিল ব্যক্তিগত পরিসরে এবং অহিংসরূপে। শরিয়াহর দৃষ্টিতে এটা চরম গর্হিত পাপ। এর ক্ষতি প্রথমত তাদের নিজেদের আখিরাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু এর সামাজিক ক্ষতি কোনোভাবেই রাষ্ট্র, সমাজ বা দীনের ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো মহামারী আকারের নৈরাজ্যকর ছিল না। এসবের চেয়েও বড় কথা হলো, তিন বছর তিন মাসের কারাবাসেই তা’যিরের উদ্দেশ্য অনেকটা অর্জিত হয়েছিল।²⁷ তাহলে বাড়াবাড়ি করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় শরিয়তের কোন মাকসাদ পূরণ করা হলো?

দ্বিতীয়ত: প্রকৃত ফাসাদ কার? কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত, কিন্তু এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া একটি দাবি অনুযায়ী, ঘটনাটি গোপনে ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তৃতীয় একজন ব্যক্তি।²⁸ দাবিটি সত্য হলে শরিয়াহর দৃষ্টিতে সেই ব্যক্তি একাধিক গুরুতর অপরাধ করেছে। যেমন, গোপনে ভিডিওধারণ ও গোয়েন্দাবৃত্তি, যা সম্পূর্ণ হারাম।²⁹ মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা প্রচার, যার জন্য কুরআন দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছে (আন-নূর: ১৯)³⁰ চার সাক্ষী ছাড়া অভিযোগ প্রচারের কারণে ওই ব্যক্তির ওপর হদ্দে কাযফের প্রশ্নও আসে। (আন-নূর: ৪)³¹ এসবের সাথে আছে সমাজে পাপের প্রচার, মানুষের সম্মানহানি। পবিত্র স্থানের মর্যাদা নিয়ে জনপরিসরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে মূলত ওই ব্যক্তির প্রচারের মাধ্যমেই।

তৃতীয়ত: পবিত্র হারাম শরীফের মর্যাদা লঙ্ঘন কতটুকু? পবিত্র হারামে এমন কাজ নিঃসন্দেহে অনেক বড় গুরুতর পাপ এবং পবিত্রতম মসজিদের মর্যাদার পরিপন্থী। কিন্তু ফিকহে প্রকাশ্যে, জনসমক্ষে ঘোষণা দিয়ে পাপ করা আর আড়ালে পাপ করার মধ্যে পার্থক্য আছে ঢের। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রকাশ্যে পাপকারী ছাড়া আমার উম্মতের সবাই ক্ষমাপ্রাপ্ত (বুখারি ও মুসলিম)।³² যদি কাজটি তারা লোকচক্ষুর আড়ালে করে থাকে, তাহলে মসজিদের মর্যাদা জনসমক্ষে ক্ষুণ্ন হয়েছে পরবর্তী প্রচারের মাধ্যমে। সংবাদ মাধ্যমের অযাচাইকৃত তথ্য অনুযায়ী যেটা তৃতীয় ব্যক্তি ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে করেছে।

চতুর্থত: দীনের ভাবমূর্তি রক্ষা হয়েছে নাকি ক্ষুণ্ন হয়েছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ বিন উবাইকে হত্যার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কারণ, যাতে মানুষ না বলে যে মুহাম্মদ নিজ সঙ্গীদের হত্যা করেন (বুখারি)।³³ এখান থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয় যে, শরিয়াহর শাস্তি কার্যকরের পর সেটার সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া কী হয় সেটাও মাকাসিদুশ শরিয়াহর অংশ। অপ্রকাশিত রায়, তথ্য গোপন রেখে দণ্ডিতের পরিবার ও দেশকে অন্ধকারে রাখা³⁴ আর হদের চেয়ে কঠোর শাস্তি মিলে আজ বিশ্বজুড়ে ইসলামি আইনকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয়েছে। ফলাফল, এটি হিফজুদ দীন বা দীন রক্ষা নয়, বরং দীনের বদনামের কারণে পরিণত হলো।

৩:৩. মক্কার ভেতরে অপরাধ: ইসলামি ঐতিহ্যে বিচারের যেসব নজির পাওয়া যায়

ক) ইবনে আব্বাস রা.-এর অনুসৃত নীতি। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি হারাম শরীফের ভেতরে অপরাধ করে, তার ওপর সেই অপরাধের শাস্তি প্রয়োগ করা হবে, যে অপরাধ সে করেছে। (আযরাকি, আখবারু মাক্কা; তাহাবি, শারহু মুশকিলিল আসার; সনদ সহিহ)।³⁵ অর্থাৎ হারামে অপরাধ করলেও শাস্তি হবে সেই অপরাধের নির্ধারিত শাস্তি, ভিন্ন বা বর্ধিত কোনো শাস্তি নয়।

খ) নবীযুগে মক্কা বিজয়ের সময় চুরির ঘটনা। মাখযুমি গোত্রের এক নারী মক্কার সীমানার ভিতরে চুরি করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ওপর চুরির নির্ধারিত হদই প্রয়োগ করেন। এমনকি উসামা রা.-এর সুপারিশও নবীজি আমলে নেন নি (বুখারি ও মুসলিম)।³⁶ এই ঘটনায় হারামের সীমানায় অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও নির্ধারিত হদ (হাত কাটা) প্রয়োগ করা হয়েছে। হারামের সম্মানার্থে বা সংবেদনশীলতার কারণে শাস্তি বাড়ানো হয় নি।

গ) আলী রা. এর নজির। স্থান হিসেবে পবিত্র হারাম বা মক্কা নগরীর যেমন মর্যাদা আছে, তেমনি পবিত্র সময় হিসেবে রমজান মাসেরও আছে বিশেষ মর্যাদা। খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে এর একটি নজির পাওয়া যায়। কবি নাজাশিকে রমজান মাসে মদপানের অপরাধে আলী রা.-এর কাছে আনা হলে তিনি প্রথমে তাকে মদের নির্ধারিত হদ হিসেবে ৮০টি বেত্রাঘাত করেন। পরদিন আরও ২০টি বেত্রাঘাত করেন। নাজাশি কারণ জানতে চাইলে আলী রা. বলেন, এই বিশটি আল্লাহর বিরুদ্ধে তোমার দুঃসাহস এবং রমজানের মর্যাদা লঙ্ঘনের জন্য। উমর রা. সম্পর্কেও অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায় (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, হাদিস ৩০৬০০–৩০৬০১; সনদে বিচ্ছিন্নতার আপত্তি রয়েছে, তবে একাধিক সূত্রে বর্ণিত)।³⁷ এই নজির থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়। এক, পবিত্র সময় বা স্থানের লঙ্ঘনকে সাহাবিরা অপরাধের গুরুত্ব বৃদ্ধির কারণ হিসেবে গণ্য করেছেন। দুই, সেই বৃদ্ধির প্রকাশ ঘটেছে মূল হদ অক্ষুণ্ণ রেখে তার সঙ্গে আলাদা তা’যির যোগ করার মাধ্যমে। তিন, সেই তা’যির বাবদ অতিরিক্ত অংশটি ছিল মূল শাস্তির এক-চতুর্থাংশ। অর্থাৎ শাস্তি মাত্রায় কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু তার ধরন বদলে যায় নাই। বেত্রাঘাতের শাস্তি কখনো পরিণত হয় নাই মৃত্যুদণ্ডে। এই মাপকাঠিতে হারামের ভেতরে অবিবাহিতের ব্যভিচারের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ যা হতে পারে, তা হলো হদের ১০০ বেত্রাঘাতের সঙ্গে আনুপাতিক কিছু তা’যির, মৃত্যুদণ্ড নয় কখনোই।

ঘ) সৌদি আরবেরই সাবেক গ্র্যান্ড মুফতির বক্তব্য। শায়খ আবদুল আযিয ইবনে বায রহ. বলেছেন, যে হারামের ভেতরে ব্যভিচারের মাধ্যমে হারামের মর্যাদা লঙ্ঘন করে, তার ওপর তার হদ প্রয়োগ করা হবে। দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় চোর নারীর হাত কেটেছিলেন।³⁸ লক্ষণীয় যে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের সাবেক প্রধানও হারামে ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে ব্যভিচারের হদকেই উল্লেখ করেছেন, নতুন বাড়িয়ে দেওয়া কোনো শাস্তির কথা বলেন নি তিনিও।

ঙ) কুরআনের হুশিয়ারির ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা’আলা যে আয়াতে বলেছেন— ‘আর যে ব্যক্তি সেখানে (মসজিদুল হারামে) অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘনের ইচ্ছা করে, তাকে আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করাব।’ (সূরা আল-হাজ্জ, ২২:২৫³⁹) মুফাসসিররা ব্যাখ্যা করেছেন, হারামে পাপের গুরুত্ব বেশি, এমনকি হারামে যদি কেউ শুধু পাপের নিয়ত করে, সেই নিয়তের জন্যও তাকে জবাবদিহি করা হবে।⁴⁰ তবে এই জবাবদিহিতা মূলত আল্লাহর কাছে, আখেরাতের সাথে সম্পর্কিত। এবং আয়াতের অর্থ এই নয় যে, দুনিয়াবি আদালতে হদ পরিবর্তন করে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে।

৩:৪. বিচারকার্যের শরঈ প্রসিডিওর: কতটা রক্ষিত হলো, কতটা লঙ্ঘিত হলো?

এই মামলায় সৌদি কর্তৃপক্ষ পূর্ণাঙ্গ রায়, বিচারিক যুক্তি, উপস্থাপিত প্রমাণ কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ার কোনো বিবরণই প্রকাশ করে নাই।⁴¹ ফলে অভিযুক্তরা আইনজীবী বা দোভাষী পেয়েছিলেন কিনা, আপিলে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে পেরেছিলেন কিনা, এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি না। হতে পারে এর সবই যথাযথভাবে রক্ষা করা হয়েছিল। তাই এই লেখায় আমরা দাবি করছি না যে এগুলো লঙ্ঘিত হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন অন্যখানে: এসব বিষয় গোপন রাখা কি খোদ ইসলামি বিচারনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়? কারণ মৃত্যুদণ্ড এমন শাস্তি, যা একবার কার্যকর হলে আর ফেরানো যায় না। তাই কার্যকর করা দণ্ডের যৌক্তিকতা ও প্রমাণের স্বচ্ছতা দেখানোর দায় দণ্ডদাতা রাষ্ট্রের। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন— শাসকের ভুলক্রমে ক্ষমা করে দেওয়া, ভুলক্রমে শাস্তি দেওয়ার চেয়ে উত্তম।⁴² এই হাদীসের অন্তর্নিহিত বার্তা কি স্পষ্ট নয়? অবশ্যই স্পষ্ট। শরিয়াহর মানশা মানুষের জীবন বাঁচিয়ে দেওয়া। পাশাপাশি তা’জিরের মাধ্যমে অপরাধকেও দমন করা।

ক) দণ্ডিত ব্যক্তি ও পরিবারের অধিকার: রায় গোপন রাখা ও পরিবারকে না জানানো কি শরিয়াহসম্মত?

নজরুলের পরিবার তার মৃত্যুর খবর পেয়েছে সংবাদমাধ্যম থেকে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাত্র তিন দিন আগেও মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল নজরুল।⁴³ কিন্তু মাত্র দুদিনের মাথায় কী অপরাধে, কোন প্রমাণে, কোন যুক্তিতে ছেলের প্রাণ নেওয়া হলো, পরিবার আজও তা জানে না। মৃত্যুদণ্ড হবে, সেটাই তো জানত না। এমনকি দণ্ডের এতদিন পরেও মরদেহ দেশে ফেরানো নিয়েও কোনো নির্দেশনা নেই।⁴⁴ ইসলামি শরিয়াহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখে না; সে একজন মুসলিম, যার দুনিয়া ও আখিরাতের কিছু অধিকার মৃত্যু পর্যন্ত বহাল থাকে। – অসিয়ত ও তাওবার প্রস্তুতি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে মুসলিমের অসিয়ত করার মতো কিছু আছে, তার জন্য অসিয়ত লিখে না রেখে দুই রাতও কাটানো উচিত নয় (বুখারি)।⁴⁵ যার মৃত্যুর দিন রাষ্ট্র নির্ধারণ করেছে, তার জন্য প্রস্তুতির এই সুযোগ আরও জরুরি। – দণ্ডের আগে স্বজন ও সম্প্রদায়কে যুক্ত করা। মা’ইয রা. ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি দিলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার গোত্রের লোকদের কাছে খোঁজ নিয়েছিলেন, তাঁর মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক কিনা (মুসলিম)।⁴⁶ অর্থাৎ এই ঘটনায় নবীজি দণ্ডের আগে অভিযুক্তের পরিচিতজনদের যুক্ত করেছিলেন। – জানাজা ও দাফনে পরিবারের হক। এক মুসলিমের ওপর আরেক মুসলিমের অধিকারের মধ্যে একটি হলো, সে মারা গেলে তার জানাজায় অংশ নেওয়া (মুসলিম)।⁴⁷ ফকিহরা মৃতের গোসল, জানাজা ও দাফনে নিকটাত্মীয়দের অগ্রাধিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।⁴⁸ পরিবারকে যখন মৃত্যুর খবরই জানানো হয় নাই, সেখানে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে অন্যসব হকের কথা জিজ্ঞেস করতেও ইতস্তত বোধ হয়। পরিবারের হক তো দূরের কথা, খোদ নজরুল নিজেও আগে তার মৃত্যুর খবর পেয়েছিলেন কিনা, অসিয়ত বা সালাতের সুযোগ পেয়েছিলেন কিনা, তা আমরা জানি না। কিন্তু তার পরিবারকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছিল সেটি প্রতিষ্ঠিত তথ্য। শরিয়াহর উপরোক্ত মানদণ্ডে এটি ন্যায়বিচারের মানবিক দিকের স্পষ্ট ঘাটতি।

খ) বিচারের স্বচ্ছতা ও উম্মাহর সামনে জবাবদিহি

– প্রকাশ্য আদালত: ইসলামি ঐতিহ্যে বিচার গোপন কক্ষের বিষয় ছিল না। আদালত ছিলো জনগণের এক্সেসের ভিতরে। নবীযুগ থেকে কাজিরা সাধারণত মসজিদে বা প্রকাশ্য স্থানে বিচার বসাতেন, যে কেউ উপস্থিত হতে পারত সেগুলোতে।⁴⁹ তাছাড়া অপরাধ ও বিচারের তথ্য মানুষের সামনে না এলে তারা এ থেকে শিক্ষা নিবে কী করে? আর শিক্ষা ও সতর্কতা (যাজর) যদি অর্জিত না হয়, তাহলে দণ্ডের মৌলিক উদ্দেশ্যই তো রইল না। – লিখিত নথি: রায়ের লিখিত নথি সংরক্ষণ করা হতো এবং প্রয়োজনে পক্ষদের দেওয়া হতো।⁵⁰ – আত্মপক্ষ সমর্থন: আলী রা.-কে বিচারক করে পাঠানোর সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, দ্বিতীয় পক্ষের কথা না শুনে রায় দিও না (তিরমিযি)।⁵¹ মালিকি ফকিহরা এ থেকে ‘ই’যার’ নীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেটি হলো রায়ের আগে বিচারক অভিযুক্তকে জিজ্ঞেস করবেন, তার পক্ষে আর কোনো যুক্তি বা প্রমাণ আছে কিনা।⁵² – সন্দেহের সন্ধান: মা’ইয রা.-এর ক্ষেত্রে স্বীকারোক্তির পরও নবীজি বারবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হয়তো তুমি শুধু চুম্বন করেছ, বা স্পর্শ করেছ বা তাকিয়েছ?’ (বুখারি)।⁵³ অর্থাৎ বিচারকের দায়িত্ব শুধুমাত্র শাস্তির কারণ খুঁজে খুঁজে বের করা নয়, বরং শাস্তি এড়ানোর মতো সন্দেহ তালাশ করা। – প্রকাশ্যে দণ্ড: কুরআন ব্যভিচারের হদ কার্যকরের সময় নির্দেশ দিয়েছে, ‘মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।’ (সূরা আন-নূর, ২৪:২)⁵⁴ শাস্তি যে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী হচ্ছে, তার সাক্ষী থাকাও এর উদ্দেশ্যের অংশ।

স্বীকার করতে হবে, বিচারকের পূর্ণ লিখিত যুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করে এমন সুস্পষ্ট নস নেই। কিন্তু প্রকাশ্য বিচার, আত্মপক্ষ সমর্থন, নথি সংরক্ষণ আর প্রকাশ্যে দণ্ড, শরিয়াহর এই পুরো কাঠামোর উদ্দেশ্য একটাই: বিচার যেন জবাবদিহির আওতায় থাকে। এখানে আমরা দেখছি তার বিপরীত চিত্র। যেমন— – প্রমাণ অজানা। কোন প্রমাণে দোষ সাব্যস্ত হলো, চার সাক্ষী, স্বীকারোক্তি নাকি অন্য কিছু, তা জানা গেলো না। এক সাংবাদিকের যাচাইহীন দাবি অনুযায়ী প্রধান প্রমাণ ছিল গোপনে ধারণ করা একটি ভিডিও।⁵⁵ দাবিটি সত্য হলে প্রশ্ন ওঠে, যে প্রমাণে এডিটিং কিংবা ডিপফেক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, ফলে সন্দেহ তৈরি হয়। আর যা নিজেই সন্দেহ তৈরি করে, এমন প্রমাণের ভিত্তিতে কি সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া যায়?⁵⁶ – আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রশ্ন। নজরুলের মা জানিয়েছেন, ভাষার কারণে ছেলে প্রথম দিকে কাউকে কিছু বোঝাতে পারেনি।⁵⁷ দোভাষী বা আইনজীবী ছিল কিনা, আমরা জানি না। জানার কোনো সুযোগও রাখা হয়নি। সমস্যা এখানেই। – বন্দি-তালিকায় নীরবতা। দণ্ড কার্যকরের মাত্র দুই সপ্তাহ আগের বন্দি-তালিকাতেও এই দুজনের সাজার ঘর ছিল ফাঁকা।⁵⁸ এমন গোপনীয়তায় আলেম, গবেষক ও সাধারণ মুসলমান কেউই যাচাই করতে পারার কথা নয় যে আল্লাহর বিধান যথাযথভাবে প্রয়োগ হয়েছে কিনা।

গ) ওয়ালিউল আমরের ক্ষমতার সীমা

সৌদি কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য সবচেয়ে শক্ত যুক্তি হলো, তা’যির ও ‘সিয়াসাহ শরইয়্যাহ’ শাসককে শাস্তি নির্ধারণের ক্ষমতা দেয়। এতে আপত্তির সুযোগ নেই সত্য। কিন্তু প্রশ্ন থাকে— এই ক্ষমতা কি সীমাহীন? ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তায় শাসকের ক্ষমতাকে তুলনা করা হয়েছে এতিমের অভিভাবকের সঙ্গে। উমর রা. বলেছিলেন, আমি নিজেকে আল্লাহর সম্পদের ক্ষেত্রে এতিমের অভিভাবকের স্থানে রেখেছি।⁵⁹ এতিমের অভিভাবক তার সম্পদ খরচ করতে পারেন, তবে কেবল এতিমের কল্যাণে, নিজের ইচ্ছামতো নয়। ঠিক তেমনি শাসকের বিবেচনার ক্ষমতাও মানুষের কল্যাণের সঙ্গে বাঁধা। ফকিহরা এই নীতিকে একটি মৌলিক সূত্রে প্রকাশ করেছেন। সেটি হলো —জনগণের ওপর শাসকের প্রতিটি সিদ্ধান্ত তাদের জন্য কল্যাণকর হওয়ার শর্তে বৈধ।⁶⁰ যে সিদ্ধান্তে কল্যাণ নেই, তা শাসকের এখতিয়ারের মধ্যেই পড়ে না। সিয়াসাহ শরইয়্যাহর অন্যতম প্রধান ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহ. নিজেই এর মাপকাঠি দিয়েছেন। তিনি ইবনে আকিল রহ. এর সংজ্ঞা উদ্ধৃত করেছেন: সিয়াসাহ হলো এমন পদক্ষেপ, যার ফলে মানুষ কল্যাণের অধিক নিকটবর্তী এবং ফাসাদ থেকে অধিক দূরে থাকে।⁶¹ তিনি আরও বলেছেন, যে পথে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয়, তা দীনেরই অংশ।⁶² অর্থাৎ সিয়াসাহর বৈধতার মানদণ্ড ন্যায় ও কল্যাণ, শাসকের ইচ্ছা নয়।

এই মানদণ্ডে প্রশ্ন দাঁড়ায়: তিন বছরের বেশি কারাভোগ করা দুজন দরিদ্র প্রবাসী শ্রমিককে, অপ্রকাশিত প্রমাণের ভিত্তিতে, পরিবার ও রাষ্ট্রকে না জানিয়ে, হদের চেয়েও কঠোর শাস্তি দেওয়ায় সমাজ কোন কল্যাণের নিকটবর্তী হলো? কোন ফাসাদ দূর হলো? যে সিয়াসাহ ন্যায় প্রতিষ্ঠার বদলে বিশ্বজুড়ে ইসলামি আইন নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করে, তা ইবনুল কাইয়িমের নিজের মানদণ্ডেও ন্যায়ভিত্তিক সিয়াসাহ বা ‘সিয়াসাহ আদিলাহ’ এর সংজ্ঞায় পড়ে না।

টীকা ও তথ্যসূত্র

(সম্পূর্ণ লেখাসহ তথ্যসূত্র ও টীকাযুক্ত পিডিএফ ফাইলটি অচিরেই ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে, ইনশাআল্লাহ)

সাজ্জাদ আকবর

সাজ্জাদ আকবর একজন তরুণ গবেষক ও লেখক। কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের আকিদা ও দর্শন বিভাগ থেকে ইসলামি ধর্মতত্ত্বে মাস্টার্স সম্পন্ন করে তিনি এখন এমফিল গবেষণায় নিয়োজিত। ইসলামি দর্শন, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, জ্ঞানতত্ত্ব ও সমাজদর্শন তার আগ্রহের কেন্দ্রে। ইবনে রুশদ, ইবনে খালদুন ও ইমাম গাজালির চিন্তাকে সমকালীন প্রশ্নের আলোকে পাঠ করাই তাঁর গবেষণার মূল দিক। ইসলামি ঐতিহ্য কীভাবে যুক্তি, বিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে, এ প্রশ্নই তার লেখা ও আলোচনার মূল উপাদান। ঢাকার মা’হাদুল ফিকরি ওয়াদ দিরাসাতিল ইসলামিয়া-এ তিনি প্রভাষক হিসেবে কর্মরত এবং Ibn Rushd Forum on Islam & Social Questions-এর প্রতিষ্ঠাতা। সহ-লেখক হিসেবে তার প্রকাশিত বই Islam & Orientalism (২০২১) এবং দুঃসময়ের বধ্যভূমিতে উত্থানের চাষাবাদ (২০২০)।